“আলোর পথে—একটি মোমবাতির গল্প”
দীপাবলীর আগে গ্রামবাংলার হাট-বাজারে আলোর উচ্ছ্বাস ছড়িয়ে পড়ে। এই সময়েই সবচেয়ে বেশি ব্যস্ত হয়ে ওঠেন মোমবাতি তৈরির কুটির শিল্পীরা। তাদের ঘরে ঘরে তখন চলে কাজের ভিড়—গরম মোম গলছে, ছাঁচে ঢালা হচ্ছে রঙিন মোম, আর পাশে ছোট ছেলেমেয়েরা তুলছে শুকনো মোমবাতিগুলো।

ইসলামপুরের প্রান্তিক গ্রাম ‘বেলডাঙা’-য় বাস করে সুচিত্রা দাস, যিনি কয়েক বছর আগে ছোট্ট করে মোমবাতি তৈরির কাজ শুরু করেছিলেন। তখন তাঁর হাতে ছিল মাত্র কয়েক কিলো মোম, কিছু ছাঁচ, আর অল্প টাকা। প্রথম বছরেই দীপাবলীর সময় তিনি ২০০টা মোমবাতি বানিয়ে স্থানীয় হাটে বিক্রি করেছিলেন। লাভ খুব বেশি হয়নি, কিন্তু আলো জ্বালানোর আনন্দে ভরে গিয়েছিল তাঁর মন।
এখন সুচিত্রার সঙ্গে কাজ করে গ্রামের আরও পাঁচটি পরিবার। দীপাবলীর আগে তাঁদের বাড়ি যেন ছোট্ট কারখানায় পরিণত হয়। কেউ মোম গলাচ্ছে, কেউ ছাঁচে ঢালছে, কেউ সাজাচ্ছে ফুল ও রঙিন গ্লিটার দিয়ে। এক একটি মোমবাতি যেন শুধু আলো নয়—একটি স্বপ্ন, একটি আশার প্রতীক।
এই বছর বাজারে মোমবাতির চাহিদা অনেক বেশি। বড় দোকানদাররা শহর থেকে এসে অর্ডার দিচ্ছে গ্রামের শিল্পীদের কাছে। কেউ চান ফুলের আকৃতির মোমবাতি, কেউ চান সুগন্ধি ও ঝলমলে মোমবাতি। তবে কাঁচামালের দাম কিছুটা বেড়েছে। গত বছর যেখানে প্রতি কিলো মোম ১৮০ টাকায় মিলত, এখন সেটা ২২০ টাকায় গিয়েছে। তবুও শিল্পীরা বলছেন, “কাজ বেশি, আলো বেশি—এটাই আমাদের উৎসব।”

এই দীপাবলীতে সুচিত্রার টিম প্রায় ৫০০০টি মোমবাতি তৈরি করেছে। ছোটো থেকে বড়ো—দামও রয়েছে নানা রকম। সাধারণ সাদা মোমবাতি বিক্রি হচ্ছে ২০ টাকায়, রঙিন ডিজাইনের মোমবাতি ৫০–৭০ টাকায়, আর সুগন্ধি ডেকোরেটিভ মোমবাতি ১০০–১৫০ টাকায় পর্যন্ত।
গ্রামের মানুষ এখন গর্বিত এই কুটির শিল্প নিয়ে। অনেকে নতুন করে যোগ দিচ্ছে এই কাজে। মেয়েরা বলছে, “এটা শুধু ব্যবসা নয়, এটা আমাদের নিজের হাতে তৈরি আলো।”
দীপাবলীর রাতে যখন শহর থেকে গ্রাম পর্যন্ত হাজার হাজার মোমবাতি জ্বলে ওঠে, তখন সুচিত্রা দাঁড়িয়ে থাকে নিজের উঠোনে। চারদিকে আলো, হাসি আর উজ্জ্বল মুখ। সে জানে—এই আলোর পেছনে রয়েছে তাঁর পরিশ্রম, তাঁর শিল্প, আর তাঁর গ্রামের মানুষদের ভালোবাসা।

মোমবাতি শুধু অন্ধকার দূর করে না, মানুষের জীবনেও আলো জ্বালায়। এই কুটির শিল্প আজ অনেক পরিবারের জীবিকা, আশার আলো। দীপাবলীর উৎসব তাই শুধু আলোর উৎসব নয়—এটা মানুষে মানুষে পরিশ্রম আর সৃষ্টির
দীপজ্বালন। 🌼🕯️













