লোককথা | অবহেলা ও আইনি জটিলতার মাঝে উত্তর দিনাজপুরের সুচিয়ানি সাপ নিকলা ফরেস্ট |

উত্তর দিনাজপুর জেলার সুচিয়ানি গ্রামে অবস্থিত জেলার দ্বিতীয় বৃহত্তম বনাঞ্চল সুচিয়ানি সাপ নিকলা ফরেস্ট আজ অবহেলা ও অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছে। প্রায় ৫০০ বিঘা এলাকা জুড়ে বিস্তৃত এই জঙ্গল একসময় ছিল ঘন অরণ্যে পরিপূর্ণ এবং লোককথা, পৌরাণিক বিশ্বাস ও পর্যটনের অন্যতম কেন্দ্র।
লোকমুখে প্রচলিত কাহিনি অনুযায়ী, এই বিস্তীর্ণ এলাকা এক সময় এক রাজার অধীনে ছিল। সেই রাজার আমলে জঙ্গলের মধ্যেই প্রায় ৫০ বিঘা এলাকা জুড়ে একটি বৃহৎ পুকুর খনন করা হয়, যা আজও ‘দুধ পুকুর’ নামে পরিচিত। পুকুরের এক প্রান্তে রাজার আমলের একটি প্রাচীন মন্দির ছিল, যেখানে নিয়মিত পূজা অনুষ্ঠিত হতো। বর্তমানে সেই মন্দির বিলুপ্তপ্রায়, শুধু কিছু ভগ্নাবশেষ টিকে আছে।
দুধ পুকুরের নামকরণের পেছনেও রয়েছে এক রহস্যময় লোককথা। শোনা যায়, রাজা স্বপ্নাদেশ পেয়েছিলেন যে পুকুরে বাস করে এক বিশালাকার দৈত্যাকার সাপ। সেই স্বপ্নাদেশ অনুযায়ী রাজা প্রজাদের নির্দেশ দেন প্রতিদিন পুকুরে দুধ ঢালতে। কিন্তু একসময় প্রজাদের মধ্যে অসন্তোষ দেখা দিলে দুধের সঙ্গে জল মিশিয়ে তা পুকুরে ঢালা শুরু হয়। এরপরই সেই বিশাল সাপ নাকি পুকুর থেকে বেরিয়ে জঙ্গলের অন্য প্রান্তে গিয়ে অদৃশ্য হয়ে যায়। এই ঘটনাকেই কেন্দ্র করে জঙ্গলের নামকরণ হয় ‘সাপ নিকলা জঙ্গল’।
এক সময় এই জঙ্গল ঘিরে পর্যটনের যথেষ্ট সম্ভাবনা তৈরি হয়। সরকারিভাবে একটি প্রকল্প গ্রহণ করে চারিদিকে লোহার ফেন্সিং, পর্যটকদের বসার জায়গা, কংক্রিটের ঘর ও টিকিট কাউন্টার নির্মাণ করা হয়। দূরদূরান্ত থেকে বহু পর্যটক এখানে ভ্রমণে আসতেন। তবে গত তিন বছর ধরে এই জঙ্গলে সাধারণ মানুষের প্রবেশ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। প্রকল্পটি মাঝপথে থমকে যাওয়ায় বর্তমানে সেই সমস্ত অবকাঠামো ভগ্নাবশেষে পরিণত হয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, জঙ্গলের অপর প্রান্তে অবস্থিত দুটি গ্রামের কিছু মানুষ দিনের পর দিন অবৈধভাবে গাছ কেটে নিয়ে যাচ্ছে। কোথাও কোথাও লোহার ফেন্সিং খুলে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে, আবার বিভিন্ন মূল্যবান ও ঔষধিমূলক গাছগাছড়াও চুরি হয়ে যাচ্ছে। এর ফলে ধীরে ধীরে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে এই বনাঞ্চলের পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য।
এছাড়াও স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, এক প্রভাবশালী ব্যক্তি দাবি করেছেন যে তাঁর পূর্বপুরুষের অংশীদারি জমির কিছু অংশ এই ফরেস্টের অন্তর্ভুক্ত। এই দাবিকে কেন্দ্র করে বর্তমানে বিষয়টি আদালতে বিচারাধীন রয়েছে, যা বন সংরক্ষণ ও উন্নয়নের ক্ষেত্রে আরও জটিলতা তৈরি করেছে।
সব মিলিয়ে সুচিয়ানি সাপ নিকলা ফরেস্ট আজ এক গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের মুখে দাঁড়িয়ে—যদি পরিকল্পিতভাবে পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে এর উন্নয়ন হয়, তাহলে তা স্থানীয় মানুষের জীবিকা ও অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। আবার, যদি অবহেলা ও অবৈধ কার্যকলাপ চলতেই থাকে এবং এই জঙ্গল ধ্বংস হয়ে যায়, তবে তার সুদূরপ্রসারী ক্ষতিকর প্রভাব পড়বে প্রকৃতি ও পরিবেশের উপর। এখন দেখার বিষয়, প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট দপ্তর কবে এবং কীভাবে এই ঐতিহাসিক ও প্রাকৃতিক সম্পদকে রক্ষা করতে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করে।












